বেতাল-পঞ্চবিংশতি

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত 'বেতাল-পঞ্চবিংশতি' গ্রন্থের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত প্রথম গ্রন্থ। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগর উত্তরভারতীয় কবি লল্লুলাল (লাল্লু লাল) রচিত হিন্দি ‘বেতাল পচীসী’ গ্রন্থাবলম্বনে এই গ্রন্থ রচনা করেন। আপাতদৃষ্টিতে অনুবাদ মনে হলেও তিনি হুবহু অনুবাদ না করে মূল গ্রন্থের আলোকে তাঁর নিজস্ব শৈলীতে এটি রচনা করেন। বেতাল পঞ্চবিংশতি তাঁর প্রথম গ্রন্থ হলেও এই গ্রন্থে শক্তিশালী গদ্যের লক্ষণ সুষ্পষ্ট ছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় গ্রন্থের বিজ্ঞাপনে রচনার হেতু উল্লেখ করে লেখেন— ‘কালেজ অব ফোর্ট উইলিয়ম নামক বিদ্যালয়ে, তত্ৰত্য ছাত্ৰগণের পাঠার্থে, বাঙ্গালা ভাষায় হিতোপদেশ নামে যে পুস্তক নির্দিষ্ট ছিল, তাহার রচনা অতি কদৰ্য্য। বিশেষতঃ, কোনও কোনও অংশ এরূপ দুরূহ ও অসংলগ্ন যে কোনও ক্রমে অর্থবোধ ও তাৎপর্যগ্ৰহ হইয়া উঠে না। তৎপরিবর্ত্তে পুস্তকান্তর প্রচলিত করা উচিত ও আবশ্যক বিবেচনা করিয়া, উক্ত বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মহামতি শ্ৰীযুত মেজর জি. টি. মার্শল মহোদয় কোনও নূতন পুস্তক প্রস্তুত করিতে আদেশ দেন। তদনুসারে আমি, বৈতালপচীসীনামক প্রসিদ্ধ হিন্দী পুস্তক অবলম্বন করিয়া, এই গ্রন্থ লিখিয়াছিলাম।’

বলে রাখা দরকার, ‘বেতাল পচ্চীসি’ও কবি লল্লুলালের মৌলিক রচনা নয়, রচনাশৈলী তাঁর নিজস্ব হলেও এর মূলে রয়েছে সংস্কৃত ‘কথাসরিত্সাগর’-এর বিক্রম-বেতাল উপাখ্যান।

বিদ্যাসাগরের কৃতিত্ব এই যে, তিনি কেবল অনুবাদ করেননি; বরং কাহিনিগুলোকে বাংলা পাঠকের উপযোগী করে সংক্ষেপ, সংযোজন, পুনর্বিন্যাস ও ভাষাগত পরিমার্জন করেছেন।

উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রমাদিত্য এক তান্ত্রিকের অনুরোধে শ্মশান থেকে একটি বেতালকে ধরতে যান। প্রতি বার বেতাল তাঁর কাঁধে চড়ে একটি গল্প বলে এবং শেষে একটি নৈতিক বা যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন করে। রাজা উত্তর জানার পরও নীরব থাকতে পারেন না; উত্তর দিলেই বেতাল আবার গাছে ফিরে যায়। এইভাবে পঁচিশটি কাহিনি আবর্তিত হয়।

এই কাঠামোটি ভারতীয় আখ্যানসাহিত্যের অন্যতম সফল ফ্রেম-ন্যারেটিভ (frame narrative)।

বিদ্যাসাগরের পূর্ববর্তী বাংলা গদ্য ছিল অনেকাংশে অনিয়মিত, আঞ্চলিক ও দীর্ঘসূত্র। ‘বেতাল-পঞ্চবিংশতি’-তে তিনি— বাক্যগঠনকে সুশৃঙ্খল করেন, বিরামচিহ্নের ব্যবহার সুসংহত করেন, যুক্তিপূর্ণ অনুচ্ছেদ বিন্যাস প্রয়োগ করেন, সংস্কৃতঘেঁষা কিন্তু স্বচ্ছ ও পাঠযোগ্য গদ্য নির্মাণ করেন।

উদাহরণস্বরূপ, তাঁর বাক্যে একটি যুক্তির ক্রম থাকে—কারণ, ঘটনা, ফলাফল। এই বৈশিষ্ট্য পরবর্তী বাংলা প্রবন্ধ ও পাঠ্যপুস্তক রচনায় গভীর প্রভাব ফেলে।

অনেক গবেষকের মতে, ‘বেতাল-পঞ্চবিংশতি’ বাংলা গদ্যের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। বিদ্যাসাগর এখানে যে সাধু গদ্যরীতি ব্যবহার করেন, তা দীর্ঘদিন বাংলা সাহিত্যের মান্য গদ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল।

প্রতিটি গল্পের শেষে বেতালের প্রশ্ন পাঠককে বিচার করতে বাধ্য করে। ফলে গ্রন্থটি কেবল বিনোদনমূলক নয়; এটি নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনের গ্রন্থ।

উনবিংশ শতকে বাংলার বিদ্যালয়গুলোতে এই গ্রন্থ বহুদিন পাঠ্য ছিল। সহজ কাহিনি, পরিষ্কার ভাষা এবং নৈতিক প্রশ্নের কারণে এটি নবশিক্ষিত পাঠকের জন্য আদর্শ বলে বিবেচিত হয়।

কিছু সমালোচক মনে করেন, বিদ্যাসাগরের ভাষা অতিরিক্ত সংস্কৃতনির্ভর। আধুনিক পাঠকের কাছে কিছু বাক্য কৃত্রিম মনে হতে পারে। তবে এই সমালোচনার ঐতিহাসিক সীমা আছে। বিদ্যাসাগরের সময়ে বাংলা গদ্যের একটি শৃঙ্খলিত লিখিত রূপ নির্মাণ ছিল প্রধান কাজ; সেই প্রেক্ষাপটে তাঁর ভাষা ছিল যুগান্তকারী।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি লোককাহিনিকে কেবল সংরক্ষণ করেননি, তাকে শিক্ষামূলক সাহিত্যে উন্নীত করেছেন।

১৮৪৭ সালে সংস্কৃত প্রেস থেকে প্রকাশের ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যাসাগর তখন সংস্কৃত কলেজের সঙ্গে যুক্ত এবং বাংলা শিক্ষার প্রসারে সক্রিয়। সংস্কৃত প্রেস ছিল তাঁর শিক্ষাবিষয়ক ও ভাষাসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের একটি প্রধান মাধ্যম। ‘বেতাল-পঞ্চবিংশতি’র জনপ্রিয়তা এত বেশি ছিল যে পরবর্তী কালে এর অসংখ্য সংস্করণ প্রকাশিত হয় এবং এটি বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত গ্রন্থে পরিণত হয়।

‘বেতাল-পঞ্চবিংশতি’ বাংলা সাহিত্যে দ্বৈত গুরুত্ব বহন করে—একদিকে এটি ভারতীয় লোককাহিনির এক মনোমুগ্ধকর সঙ্কলন, অন্যদিকে আধুনিক বাংলা গদ্যের ভিত্তিনির্মাণকারী গ্রন্থ। বিদ্যাসাগর অনুবাদকে সৃজনশীল রূপান্তরে উন্নীত করেছিলেন। তাঁর ভাষা, যুক্তিবোধ, কাহিনি-সংগঠন ও শিক্ষামুখী দৃষ্টিভঙ্গি এই গ্রন্থকে সাধারণ গল্পের বইয়ের সীমা ছাড়িয়ে বাংলা নবজাগরণের এক ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত করেছে। উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা গদ্য, শিক্ষাচিন্তা ও সাহিত্যরুচির বিকাশ বুঝতে ‘বেতাল-পঞ্চবিংশতি’ আজও অপরিহার্য পাঠ।

নিবন্ধটি রচনা করেছেন, তাহের আলমাহদী