এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত 'বাঙ্গালার ইতিহাস (দ্বিতীয় ভাগ)' গ্রন্থের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা শিক্ষাসাহিত্যের ইতিহাসে ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’-রচিত ‘বাঙ্গালার ইতিহাস (দ্বিতীয় ভাগ)’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বাংলা ভাষায় ইতিহাসচর্চাকে বিদ্যালয়-উপযোগী ও সুসংহত রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেন। এটি কেবল একটি ইতিহাসের বই নয়; বরং আধুনিক বাংলা শিক্ষাব্যবস্থা, গদ্যভাষা এবং ঐতিহাসিক চেতনার বিকাশে বিশেষ অবদান রাখা একটি পাঠ্যগ্রন্থ।
‘বাঙ্গালার ইতিহাস (দ্বিতীয় ভাগ)’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার সংস্কৃত প্রেস থেকে। গ্রন্থটি বিদ্যাসাগরের মৌলিক ঐতিহাসিক গবেষণা নয়; বরং John Clark Marshman-এর ইংরেজি ‘History of Bengal’ গ্রন্থ অবলম্বনে রচিত। তবে এটি সরল অনুবাদ নয়। বিদ্যাসাগর মূল গ্রন্থের বিষয়বস্তুকে বাংলা ভাষাভাষী শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে পুনর্গঠন, সংক্ষিপ্তকরণ ও ভাষান্তরের মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র পাঠ্যগ্রন্থে রূপ দেন।
গ্রন্থটির আলোচ্য বিষয় প্রধানত বাংলার মুসলিম শাসনকাল, বিশেষ করে নবাবি আমলের রাজনৈতিক ইতিহাস। স্বাধীন সুলতানি যুগের পর থেকে পলাশীর যুদ্ধ এবং ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, শাসক, প্রশাসন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিবরণ এতে সঙ্কলিত হয়েছে।
গ্রন্থে বাংলার ইতিহাসকে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন নবাবের শাসনকাল, প্রশাসনিক পরিবর্তন, মারাঠা আক্রমণ, আঞ্চলিক শক্তির উত্থান-পতন এবং ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রমবর্ধমান প্রভাব সহজ ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে কালানুক্রমিক বিন্যাসে উপস্থাপন করায় পাঠকের কাছে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিদ্যাসাগরের উদ্দেশ্য ছিল কেবল ঘটনা বর্ণনা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিহাস সম্পর্কে একটি সুসংবদ্ধ ধারণা গড়ে তোলা। সে কারণে তিনি অপ্রয়োজনীয় অলঙ্কার বা দীর্ঘ বর্ণনা পরিহার করে সংক্ষিপ্ত, যুক্তিসংগত ও তথ্যনির্ভর উপস্থাপনা অনুসরণ করেছেন।
‘বাঙ্গালার ইতিহাস’-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর ভাষা। বিদ্যাসাগর এখানে এমন এক সাধু গদ্য ব্যবহার করেছেন, যা একদিকে মার্জিত, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য বোধগম্য। বাক্যবিন্যাস সুস্পষ্ট, যুক্তিসংগত এবং পরিমিত। ইতিহাসের মতো অপেক্ষাকৃত কঠিন বিষয়ও তাঁর ভাষার স্বচ্ছতার কারণে সহজপাঠ্য হয়ে উঠেছে।
বাংলা গদ্যের মান্যরূপ গঠনে এই গ্রন্থের গুরুত্বও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সময়ে ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও অন্যান্য পাঠ্যপুস্তক রচনায় বিদ্যাসাগরের এই ভাষাশৈলী গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
যদিও এটি মূলত একটি পাঠ্যগ্রন্থ, তবু বাংলা গদ্যসাহিত্যের ইতিহাসে এর মূল্য অপরিসীম। প্রথমত, এটি বাংলা ভাষায় ইতিহাস রচনার একটি প্রাথমিক ও সফল প্রচেষ্টা। দ্বিতীয়ত, এটি বাংলা শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিহাসকে একটি স্বতন্ত্র পাঠ্যবিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করে। তৃতীয়ত, গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় তথ্যভিত্তিক ও যুক্তিনিষ্ঠ গদ্যরীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, গ্রন্থটি ঔপনিবেশিক যুগে রচিত এবং এর প্রধান উৎসও একজন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদের রচনা। ফলে কিছু ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও ঘটনাবর্ণনায় ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার প্রভাব লক্ষ করা যায়। আধুনিক গবেষণার আলোকে কয়েকটি ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন আজ সংশোধিত হলেও, গ্রন্থটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও শিক্ষামূল্য তাতে কমে না। বরং এটি উনবিংশ শতকের ইতিহাসচর্চা ও শিক্ষাদর্শ বোঝার একটি মূল্যবান দলিল।
‘বাঙ্গালার ইতিহাস (দ্বিতীয় ভাগ)’ বাংলা ভাষায় ইতিহাসশিক্ষার পথিকৃৎ গ্রন্থগুলোর অন্যতম। জন ক্লার্ক মার্শম্যানের ইতিহাসকে অবলম্বন করলেও বিদ্যাসাগর তাঁর অসাধারণ ভাষাশৈলী, বিষয়বিন্যাস ও শিক্ষাদৃষ্টির মাধ্যমে এটিকে একটি স্বতন্ত্র বাংলা গ্রন্থে পরিণত করেন। ইতিহাসকে সহজবোধ্য, যুক্তিনিষ্ঠ এবং পাঠযোগ্য করে তোলার যে আদর্শ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা বাংলা পাঠ্যপুস্তক রচনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন অনুসৃত হয়েছে। ইতিহাসের তথ্য, গদ্যের শৃঙ্খলা এবং শিক্ষামূলক উপস্থাপনার সফল সমন্বয়ের জন্য ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ আজও বিদ্যাসাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রচনা এবং বাংলা শিক্ষাসাহিত্যের ইতিহাসে একটি স্থায়ী সম্পদ।
বাঙ্গালার ইতিহাস : গ্রন্থ-পরিচয় ও মূল্যায়ন, লিখেছেন, তাহের আলমাহদী